in

টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে বাঙালি জাতির পিতা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মবার্ষিকী আজ। তার ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সোনার বাংলা বিশ্ব মানচিত্রে গর্ব ও সম্মানের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘ সংগ্রাম মুখর জীবনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উদযাপন করা হচ্ছে।

শিশুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দরদ ছিল অপরিসীম। শিশুদের খুবই ভালোবাসতেন তিনি। জন্মদিনে তিনি শিশুদের সঙ্গে কাটাতে পছন্দ করতেন। ওইদিন শিশুরা দল বেঁধে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে যেতো। এসব সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৬ সালে প্রথম বাংলাদেশে জাতীয় শিশু দিবস পালন করা হয়।

ছোট বেলা থেকে বিকশিত বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুণাবলির কথা তুলে ধরে তার কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাল্যকাল থেকেই তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন নির্ভীক, দয়ালু এবং পরোপকারী।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় প্রখ্যাত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুজিবুর রহমান (খোকা)। শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সায়েরা খাতুনের চার মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে তৃতীয় সন্তান তিনি। মা-বাবা ডাকতেন খোকা বলে। খোকার শৈশবকাল কাটে টুঙ্গিপাড়ায়। সেই খোকার হাত ধরেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

১৯২৭ সালে সাত বছর বয়সে খোকা গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। নয় বছর বয়সে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর একটি চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। তখন তার লেখাপড়ায় সাময়িক বিরতি ঘটে। চার বছর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পর ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই তার রাজনৈতিক জীবন শুরু।

১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং খাদ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে বাংলা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ওই সময় বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে একটি দল তাদের কাছে যায়। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই বছর তিনি গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং মহকুমা মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন তিনি। এ সময়ে তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

১৯৪১ সালে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রমুখ যোগ দেন। শেখ মুজিব এই সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক ছিলেন। ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (এনট্র্যান্স) পাস করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে এই কলেজ থেকেই তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। এখানে পড়াশোনাকালীন তিনি বাংলার অগ্রণী মুসলিম নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। একই বছর কলকাতায় ছাত্রনেতা আবদুল ওয়াসেক প্রমুখের নেতৃত্বে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ওই সময় থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন।

১৯৪৩ সালে শেখ মুজিব বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন। ওই বছর বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে শেখ মুজিব বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কলকাতায় বসবাসকারী ফরিদপুরবাসীকে নিয়ে তৈরি ‘ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের’ সেক্রেটারি মনোনীত হন। এর দুই বছর পর ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন।

১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৬ ছয় দফা, ১৯৬৮ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ নির্বাচন-দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম-আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।

ঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চে ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তার আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার নিরস্ত্র জনগণ ঘরে ঘরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলেছিল। তিনি ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ মহান শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান লাভ করে।

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুন বাংলাদেশকে শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপন করেন। এক কোটি বাঙালি-শরণার্থীর পুনর্বাসন, তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে ফেরত পাঠানো, দশ মাসের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান প্রণয়ন, একশোরও বেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়, জাতিসংঘ, ন্যাম, ওআইসি, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভসহ বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য কাজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাল্যকাল থেকেই তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন নির্ভীক, দয়ালু এবং পরোপকারী। স্কুলে পড়ার সময়েই নেতৃত্বের গুণাবলি ফুটে ওঠে তার মধ্যে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অধিকার আদায়ের শেষ আশ্রয়স্থল। প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এ বিশ্ববরেণ্য নেতার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এ বাঙালি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। জাতির পিতার ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্ব এবং সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব সমগ্র জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেছিল। যার ফলে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বিকাশ ঘটেছে বাঙালি জাতিসত্তার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বাঙালি জাতিরই নয়, তিনি ছিলেন বিশ্বের সকল নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায় ও মুক্তির অগ্রনায়ক।’

বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হয়েছে সত্য। কিন্তু তার মৃত্যুর পরেও তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা এতটুকুও কমেনি। ২০০৪ সালের বিবিসি জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী হিসেবে নির্বাচিত হন। এই জরিপে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বিতীয় ও কাজী নজরুল ইসলাম তৃতীয় হয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনি বাঙালী জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছেন এবং একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এভাবে টুঙ্গিপাড়ার সেই খোকা ক্রমান্বয়ে পরিণত হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির পিতা।

সৌজন্য ঢাকা মেইল, সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস, বাসস, উইকিপিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published.

GIPHY App Key not set. Please check settings

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: নাপা নয়, বিষ দিয়ে ২ শিশুকে হত্যা

ঢাকা থেকে কলকাতা ট্রেনের সময়সূচি ও ভাড়া