in ,

তিমির বিদারী জ্যোতিষ্ক

বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণায় বলেছিলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ অর্থাৎ, স্বাধীনতা দিবস মানে প্রত্যেক বাঙালির কাছে মুক্তির প্রতিজ্ঞায় উদ্দীপ্ত হওয়ার ইতিহাস। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন এই স্বাধীনতা। এই অর্জন জাতিকে তার বহু কাঙ্ক্ষিত একটি সার্বভৌম দেশ, স্বাধীন জাতিসত্তা, একটি সংবিধান, নিজস্ব মানচিত্র ও একটি পতাকা উপহার দিয়েছে। অথচ পাকিস্তানি হায়েনারা সেদিন ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে এই নিরস্ত্র-ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ইতিহাসের জঘন্যতম ও নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করে তারা ভেবেছিল-এই প্রজন্মমের বিনাশ করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু না, সত্য তো এটাই যে সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই বাঙালি জাতি একটি ইস্পাত-কঠিন প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যয় বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জীবন উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠিত হয়নি এবং বুকের তাজা রক্তের সাগর পারি দিয়ে ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের গৌরবোজ্জ্বল পতাকা।

আমরা যদি একাত্তরপূর্ব ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করি, এটা পরিষ্কার হয়ে উঠবে- এই অর্জনের পেছনে রয়েছে বাঙালির দীর্ঘ শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। ’৪৭-এর দেশ ভাগের পর ২৩ বছর বৈষম্যে জর্জরিত হয় পূর্ব পাকিস্তান নামের এই ভূখণ্ডটি। আমরা দেখতে পাই, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে বীজ প্রোথিত হয়েছিল, দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একাত্তরের ২৬শে মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়। তাঁরই নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় হিংস্র পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় বহু-কাঙ্ক্ষিত বিজয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে আসে একাত্তর। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে জাতির পিতার সেই উদ্দাত্ত কণ্ঠের উচ্চারণই ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির চূড়ান্ত উচ্চারণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

স্বাধীনতা দিবস ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে পদার্পণ করে যাঁকে প্রথমেই স্মরণ করতে হয়; যাঁকে ছাড়া অধরাই থেকে যেত বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন, মুক্তির স্বপ্ন; তিনি হলেন বাঙালি জাতির কাণ্ডারি হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি বিশ্বের চির বিস্ময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে ইতিহাস, সৃষ্টি হয়েছে গাঙ্গেয় বদ্বীপের একটি বিশাল জাতির জন্মগাঁথা। এই একটি মানুষ যাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি স্তরে রচিত হয়েছে এক মহান মুক্তিসংগ্রামের অমর পংক্তিমালা। বাঙালির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে কখনও তার আত্মপরিচয়ের সন্ধান ছিল না, কখনও তার আত্মপরিচয়ের ইতিহাস ছিল না। এই মহান মানুষটি এ জাতির অপ্রাপ্তির যাতনার অবসান ঘটিয়েছেন। অথচ ৭৫-এ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ভেবেছিল বাংলাদেশের হৃদয় থেকে তাঁর নাম চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেবে; ৭১-এ পরাজিত শক্তির করতলে আবার দেশটাকে নিপতিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা তো এটাই যে, যতই সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই তিনি অধিকতর ঔজ্জল্য নিয়ে পরিব্যাপ্ত হচ্ছেন। তাঁর দেশপ্রেম, তাঁর দূরদর্শিতা, তাঁর জাদুকরী সাংগঠনিক ক্ষমতা, তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে সারা জীবনের সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি জাতিকে শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন, সেই ইতিহাস, সেই অমর কীর্তিকে ঘাতকেরা কি মুছে দিতে পেরেছে? বরং, সেই দেশটিই আজ পৃথিবীর বিস্ময়, বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ পুরো বিশ্বকে সম্মোহিত করে এগিয়ে চলেছে দোর্দণ্ড প্রতাপে।

আজ স্বাধীনতার ৫০টি বছর পেরিয়ে যদি একটু ফিরে দেখি কেমন ছিল দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ ও ব্যবচ্ছেদ, তাহলে সহজেই দেখা যাবে স্বাধীনতার ৫০ বছর একটি দীর্ঘ সময় মনে হলেও, এ দেশটি তার বেশির ভাগ সময়ই অতিবাহিত করেছে সামরিক ফন্দীবাজ, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি, সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় মৌলবাদ আর ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতাপে। বিশেষ করে ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরেই এ জাতির জীবনে নেমে এসেছিল এক দীর্ঘ অমানিশার কৃষ্ণবিবর। যারা পরবর্তীতে দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে নেতৃত্ব দিবেন, আমরা সেই জাতীয় চার নেতাকেও হারিয়ে ফেললাম। নির্মমভাবে জেলখানার মধ্যে তাঁদেরকে হত্যা করা হলো। বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয়কে দেশে ফিরতে দেয়া হয়নি, পরদেশে ভেসে ভেসে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হয়েছে, সেখানেও তাঁদেরকে হত্যার নানা পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা দেখেছি ‘বিশ্ব বেহায়া’র দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসন। পাকিস্তানের চর রাজনীতিকে যিনি জটিল করে দেয়ার মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন; দেশটাকে আবার পাকিস্তানের আদলে তৈরি করে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেবার মিশন নিয়েছিলেন; শত শত মুক্তিযোদ্ধা আর্মি অফিসারকে বিচারের নামে প্রহসন করে হত্যা করেছিলেন, সেই জিয়াউর রহমানের নির্মমতা ও অমানবিকতারও সাক্ষী আমরা। আমরা এ-ও দেখি এই স্বাধীন বাংলাদেশে ৭১-এ পরাজিত মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিকে নানাভাবে পুনরুজ্জীবিত করা, তাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, সরকারের অংশীদার করা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও জামাত হেফাজতের তাণ্ডব দেখেছি দেশব্যাপী। অর্থাৎ দেশটাকে যারা মেনে নেননি, সেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতেই দেশটি পরিচালিত হয়েছে সুদীর্ঘকাল। এতদসত্ত্বেও, আজ আমরা যে দেশটিকে নিয়ে গর্ব করছি, সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি, যে অভাবিত উন্নতির জন্যে পুরো বিশ্ব উন্নয়ের ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তাকে সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পথটি কি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের জন্যে এতো সহজ ছিল?

অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত যে দেশটিকে বঙ্গবন্ধু ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলতে দিন-রাত পরিশ্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় করলেন; জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সদস্যপদ অর্জন যখন বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিলো তখনই বঙ্গবন্ধুকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। তারপর দীর্ঘকাল দেশটি কানাগলিতে ঘুরপাক খেয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে চরে। তা সত্ত্বেও সময়ের পরিক্রমায় যখন আবার দুষ্টচক্রের হাত থেকে মুক্ত করে দেশটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির হাতে এসে পৌঁছেছে, তখন বঙ্গবন্ধুর দেয়া রূপরেখা ও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আজকের বাংলাদেশকে পেয়েছি; যেই দেশটি দুর্বার গতিতে নিরলস ছুটে চলেছে জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তয়নের লক্ষ্য নিয়ে।

সুদীর্ঘ এই পথচলার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আসলে কি? সুদূরপরাহত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাজাকারের বিচার এই বাংলায় দেখে যেতে পারবে বলে অনেকেই আশা ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর-সেটা সম্ভবপর হয়েছে; যা বাঙালি জাতিকে তার ইতিহাসের দায় ও কলংকে কিছুটা হলেও মোচন করেছে। যে দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে পরিহাস করেছিলেন হেনরী কিসিঞ্জার, সেই দেশটিই আজ তাদের কপালে ভাঁজ ফেলে দেবার মতো সফলতা অর্জন করেছে। আধুনিক কৃষি, তৈরি পোশাক, দারিদ্র্য দূরীকরণ, অর্থনীতি, রেমিট্যান্স, গড় আয়ু, আমদানি, রফতানি, রিজার্ভ, মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, নারী শিক্ষা, কলকারখানায় উৎপাদনসহ অনেক সূচকে এখন বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। এক সময় বৈদেশিক অর্থ তথা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির অর্থ ছাড়া উন্নয়ন কর্মকান্ড কল্পনাও করা যেত না। এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভবপর হচ্ছে। সারাদেশের হাজার হাজার মাইলের মহাসড়ক নির্মাণ-সংস্কার, মেট্রোরেল, ট্যানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, রূপপুর পারমাণবিক প্ল্যান্ট, ফ্লাইওভার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবন, রেল উন্নয়ন, নৌপথ তৈরি, নাগরিকদের জন্য শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত ছাড়াও সীমাহীন উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে দেশ। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধা সহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সুবিধা পাওয়া যায়। সামাজিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কীভাবে দেশের এই অভাবিত উন্নতি ঘটেছে তা শেখ হাসিনার বিগত বছরগুলোর কর্মযজ্ঞের দিকে তাকালেই চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সদ্যস্বাধীন দেশে ফিরে জাতির পিতা সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। ডাক দিয়েছিলেন কৃষি বিপ্লবের। আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন দুর্নীতি, কালোবাজারি, মুনাফাখোরী, লুটেরাদের বিরুদ্ধে। তাঁকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের ফলে উন্নয়নের সেই গতি থমকে দাঁড়ায়। রুদ্ধ হয় গণতন্ত্র ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজকে পরিপূর্ণতা দানের লক্ষ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘ভিশন- ২০২১’, ‘ভিশন ২০৪১’ এবং শতবর্ষ মেয়াদি ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ গ্রহণ করেছে। এসব পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো জাতিসংঘ ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট ২০৩০’ অর্জনসহ ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নসহ আর্থসামাজিক প্রতিটি সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু এখন সমাপ্তির পথে। বাস্তবায়িত হচ্ছে মেট্রোরেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী বহুমুখী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্প। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ অভিজাত স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য।

জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে অভিভাবকশূন্য করে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন চেতনার যে রাষ্ট্র দর্শন তাকেও হত্যা করার অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রকে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। দেশটাকে সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার বিষদাঁত আজও বাংলাদেশকে খুবলে খাচ্ছে! বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বল্প সময়ের শাসনকালে যেসমস্ত বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন, এতো বছর পেরিয়েও দেশে-বিদেশে আজও অনুরূপ ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কন্যাকেও। জাতির পিতা ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় বলেছিলেন-

“আজকে আমার একটিমাত্র অনুরোধ আছে আপনাদের কাছে, আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে।… আমি গ্রামে গ্রামে নামবো। এমন আন্দোলন করতে হবে যে, যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয়, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।… আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ করতে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করার জন্য, বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখমোচন করার জন্য।”

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে বিধ্বস্ত করা, বাঙালি চেতনাকে বিনষ্ট করা, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মূলোৎপাটন করার যে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের সূচনা করা হয়েছিল, যেই অন্ধকার গ্রাস করেছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্নের দেশ-মাতৃকাকে ঘিরে, সেই ষড়যন্ত্র কিন্ত আজও থেমে যায়নি। তারা যে আজও সোচ্চার এবং সময় ও সুযোগ পেলেই যে ঘাড় মটকাবে- তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। তারপরও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর এই ক্ষণে একথা জোর দিয়েই বলা যেতে পারে- বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের পথেই আছে বাংলাদেশ; যার জন্যে তিনি জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন। তিনিই বলেছিলেন, ‘রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করব!’ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘দেশ থেকে সর্বপ্রকার অন্যায়, অবিচার ও শোষণ উচ্ছেদ করার জন্য দরকার হলে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করবো।’ রক্ত দিয়েই ঋণ শোধ করেছিলেন তিনি আর তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের গুরুভার তাঁরই সুযোগ্য কন্যা কাঁধে তুলে নিয়েছেন এবং সকল ষড়যন্ত্র ও অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে ‘মুক্তির দূত’ হয়ে জাতির মুক্তির সূর্যকে ঠিকই ছিনিয়ে আনবেন-এ বিশ্বাস এখন বাংলার মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। সর্বোত্তম মুক্তির লক্ষ্যে প্রদীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অভিমুখে- মহান স্বাধীনতা দিবসে এই হোক প্রত্যয়।

 

লেখক: আবেদ খান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক জাগরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

GIPHY App Key not set. Please check settings

গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছে সরকার

বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা