in

প্রাণের উৎসব বর্ষবরণ দুই বছর পর ফিরল

♦মাধ্যম ডেস্ক: মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা। আজ বৃহস্পতিবার। পহেলা বৈশাখ। শুভ বাংলা নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৯। বাঙালি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় উদ্ভাসিত সর্বজনীন উৎসবের দিন। আনন্দ-হিল্লোল, উচ্ছ্বাস-উষ্ণতায় দেশবাসী আবাহন করবে নতুন বছরকে। অর্থ-সংগতি থাকুক আর নাই থাকুক, সবার হূদয়ে আজ রবীন্দ্র-নজরুলের সুর জেগে উঠবে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…, কিংবা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি রোধে গত দুই বছর বর্ষবরণ হয়নি স্বাড়ম্বরে। এবার করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হওয়ায় ফিরে এসেছে চিরচেনা উৎসব বর্ষবরণ। তবে রোজার কারণে বর্ষবরণ আয়োজনে অনেকটাই খামতি রয়েছে এবার। তারপরও নানা আয়োজনে মেতে উঠবে বাঙালি জাতি। নতুন এই দিনটি পুরোনো সব ব্যর্থতা ও আবর্জনার জঞ্জাল সরিয়ে নতুন আশা, কর্মোদ্দীপনা, স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হওয়ার ডাক দিচ্ছে। নতুনের কেতন ওড়ানো বৈশাখ এসেছে নতুন সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও সমৃদ্ধি অর্জনের লড়াইয়ে জয়লাভের প্রতিশ্রুতি ও প্রেরণা নিয়ে। খরতাপ কিংবা অকাল বর্ষা উপেক্ষা করে দেশের প্রতিটি পথে, মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে লাখো কোটি মানুষের প্রাণচাঞ্চল ও উৎসব মুখরতার এক বিহ্বলতা।

নতুন বছর মানেই এক নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথ চলা। বুকভরা তেমনি প্রত্যাশা নিয়ে নতুন উদ্যমে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি আজো সোচ্চার হয়ে উঠবেন সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ নিধনের দাবিতে। সেই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি আত্ম-মর্যাদাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়েও লাখো-কোটি বাঙালি শামিল হবেন সর্বজনীন বৈশাখী উৎসবে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাকার আজ নববর্ষে আমাদেরও প্রত্যাশা— এসো এসো এসো হে বৈশাখ/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে… মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক…শাশ্বত সেই শুচিশুভ্রতার স্বপ্নে অতীতের জীর্ণ মালিন্যকে পেছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার দিন আজ।

নতুন স্বপ্নের লাল হালখাতা খোলার দিন পহেলা বৈশাখ। তাই নববর্ষ বাঙালি ঐতিহ্যের অহংকার।

নববর্ষ উদযাপনে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ এখন উৎসবে মাতোয়ারা। তবে এবার রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে এবারের আয়োজনে কিছুটা খামতি থাকবে।

সবার প্রাণে বেজে উঠেছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই দৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা— তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড় … তোরা সব জয়ধ্বনি কর।—এই সুরধ্বনির ভেতর দিয়েই নতুন বছরে সব অপ্রাপ্তি আর ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যাপিত হবে নববর্ষ।

দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা যাই হোক না কেনো সবার মনে আনন্দ-উৎসবের শখ-আহ্লাদ এতটুকু কমেনি বরং বেড়েছে। নতুন বছরের কাছে মানুষের প্রত্যাশা সামনের দিক আরো ভালো হোক। ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা’ পুড়িয়ে ফেলে, হতাশা-অবসাদ-গ্লানি ঝেড়ে-মুছে ফেলে নতুন উদ্দীপনায় জাগরণের আহ্বান জানাচ্ছে বৈশাখ। হিংসা-বিদ্বেষ, ক্ষুদ্রতা, কলুষ, কুসংস্কার এবং পশ্চাৎপদতার নিগড় ভেঙে ফেলে, অসুন্দরকে বর্জন করে সমাজ মুক্ত হোক, সত্যিকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসুক, প্রগতির আলোয় উদ্ভাসিত হোক সমাজ এ আহ্বান জানাচ্ছে বৈশাখ।

ভোরে দিগন্তের তিমিরে সূর্যোদয়ের প্রথম রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সূচিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৯-এর জন্মক্ষণ। তখন থেকেই বৈশাখের সর্বজনীন উৎসব-আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সারা দেশ, সব বয়সের মানুষ। শহরের রাস্তা ও উদ্যানে নেমেছে অগণিত মানুষের ঢল। শুধু তাই নয়, শহর-নগর, গ্রাম-গ্রামান্তর সর্বত্রই বইছে বর্ষবরণের প্রাণোচ্ছল উৎসব-তরঙ্গ।

কাকডাকা ভোর থেকে আজ চলবে বৈশাখবরণ। কোথাও গান বাজছে, কোথাও মেলা বসেছে। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ঢাকের শব্দ, ঢোল, বাঁশি, নাগরদোলার শব্দ, পায়ে পায়ে উত্থিত ধূলিপুঞ্জের মধ্যে মানুষের গুঞ্জরণ-ধ্বনি, নাগরদোলায় ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে ভয় জাগানো কিছু শব্দ, শিশুর কলরব উচ্ছ্বাস।

বৈশাখী মেলায় তাকালেই দেখা যাচ্ছে রং-বেরঙের হাতের চুড়ি, কানের দুল, চুলের ফিতা, রঙিন বেলুন, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল, মুড়ি-মুড়কি, উখরা-খই, হাওয়াই মিঠাই, জিলাপি, চিনির সাচ-বিন্নির খই-বাতাসা, ঘর-গেরস্থলির দরকারি বস্তু… আরো কত কি! কিন্তু এবার রমজান হওয়ায় এসব অনেকটাই খামতি রয়েছে। প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়ার কোনো আয়োজন নেই।

গতকাল বুধবার চৈত্রের শেষ দিনে গ্রাম ও শহরে ব্যবসায়ীরা গত বছরের বিকিকিনির হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার খুলবেন লাল মলাটের হালখাতা। রমনার অশত্থমূলে (বটমূল নয়) ষাট দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার নবউন্মেষকালে ছায়ানট সেই যে কাকডাকা ভোরে নববর্ষকে আবাহনী গান গেয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সেটি আজ রাজধানীবাসীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

আজ সরকারি ছুটি। সংবাদপত্র অফিসও বন্ধ। সংবাদপত্রগুলো বের করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি রেডিও-টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছে এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় জীবনে পরম আনন্দের দিন। এ দিনে চির নতুনের বার্তা নিয়ে আমাদের জীবনে বেজে উঠে বৈশাখের আগমনি গান। দুঃখ, জরা, ব্যর্থতা ও মলিনতাকে ভুলে সবাই জেগে ওঠে মহানন্দে। পহেলা বৈশাখের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনার স্বরূপ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর উৎসবপ্রিয় বাঙালি জাতিকে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করতে হয়েছে ঘরবন্দি অবস্থায়। আশা করছি, এ বছরের পহেলা বৈশাখ আবার আনন্দঘন পরিবেশে উদ্যাপিত হবে। একইসঙ্গে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, উগ্রবাদ তথা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ তথা সুখী-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবারের বৈশাখ হবে আমাদের জন্য বিপুল প্রেরণাদায়ী।

পহেলা বৈশাখে রবীন্দ্র-নজরুলসহ বাংলা ভাষার কবিদের কাছে বরিত হয়েছে বিচিত্র ভাবের আবেগে বহুকাল আগে থেকেই। আজো সে ধারা বহমান। বৈশাখের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। ‘ওই আসে ওই নব হরষে’ বলে যে উদ্দীপনা জাগায় বাংলা নববর্ষ বৈশাখ, কিংবা কবি কাজী নজরুল যখন বলেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়’ তখন বৈশাখের ধ্বংসের মধ্যে নবসৃষ্টির উদ্দীপনা আমাদের উদ্বুদ্ধ করে।

নববর্ষে দেশজুড়ে আজ যে উৎসবের আলোড়ন, তা লড়াইয়ের ফসল। আমরা বাংলা নববর্ষকে অর্জন করেছি সাংস্কৃতিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। যখনই সাম্প্রদায়িকতার বাধা এসেছে, তখনই সংস্কৃতিকর্মীরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। ষাটের দশকে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক শাসকরা যখন বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু’ বলে তার সাহিত্য বর্জন করল, রেডিও-টেলিভিশনে নিষিদ্ধ হলো রবীন্দ্রসঙ্গীত, তখনই প্রগতির যোদ্ধা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকর্মীরা ছায়ানট গঠন করে রমনার অশত্থমূলে (যেটি বটমূল বলে বহুল পরিচিত) সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ডিএল রায়সহ পঞ্চকবির গানে বর্ষবরণের দ্রোহী কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হয়। সেই ধারাই দিনে দিনে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে করেছে বেগবান। রাজনীতিকেও মুক্তিযুদ্ধের পথে যেতে বিপুল সহায়তা করেছে। এখনো যে কোনো বাধার মুখে বৈশাখ আমাদের নতুন করে প্রতিরোধের প্রেরণা জোগায়। কেননা বৈশাখের একটা রুদ্র রূপ যে আছে, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতেই তা দেখে নেয়া যায়— ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,/ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন— পিঙ্গল জটাজাল,/ তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণে ভয়াল/ করে দাও ডাক—/ হে ভৈরব হে রুদ্র বৈশাখ।

ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে, ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত-সব বয়সি মানুষের সর্বজনীন উৎসব হিসেবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে এই পার্বণ। রাজধানী ঢাকার রমনার অশত্থমূলে নববর্ষের আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। ছায়ানটের শিল্পীদের রুচিশীল সংগীত-ঝঙ্কার উপভোগ করতে প্রাণের বন্যা বয়ে যাবে রমণীয় রমনায়। ভোরের নরম সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা তবলা, মৃদঙ্গ, পাখোয়াজ আর পুং বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে একটি তাল বাদন পরিবেশনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবেন। বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত অগণিত নারী-পুরুষ-শিশু যোগ দেবেন আনন্দস্নাত মিলনমেলায়।

বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এরই মধ্যে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বেশিরভাগই রমনার ছায়ানটের অনুষ্ঠান, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানের বৈশাখী অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

GIPHY App Key not set. Please check settings

নতুন বছর বরণ করে নিচ্ছে বাঙালি

দুই জেলায় বজ্রপাতে ৮ জনের মৃত্যু