in ,

সাগর হয়ে গেল মরুভূমি

♦অনলাইন ডেস্ক, মাধ্যম: ছোট্ট শিশু খোজাবে। তার বাড়ির পাশেই অ্যারাল সাগর। প্রায় ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের সাগর নামের এ হ্রদটিতেই বন্ধুদের সঙ্গে দাপাদাপি করে কাটত ছোটবেলা। এরপর বড় হয়ে এই হ্রদকেই ভালোবেসে পেশা হিসেবে মাছ ধরাকে বেছে নিলেন। শুধু খোজাবেই নন, তার গ্রামের প্রায় সবাই মাছ ধরাকে বেছে নিয়েছিলেন জীবিকা হিসেবে। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে তাদের মাছ ধরার বিচরণক্ষেত্রগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে। মাছগুলো মরে যেতে থাকে। পরের ৪০ বছরে শুকিয়ে যায় তাদের জীবিকার উৎস অ্যারাল সাগর। তাই খোজাবে একজন জেলে হয়েও থাকেন মরুভূমিতে!

জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালে ‘অ্যারালের শুকনো অশ্রু’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, অ্যারাল সাগর নামে সাগর হলেও এটি মূলত একটি হ্রদ। বিশালতার কারণে আরবদের কাছে এটি সাগর নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ সালের দিকে এটি পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল। উত্তর থেকে সির দরিয়া ও দক্ষিণ থেকে আমু দরিয়া নদী থেকে পানি এসে মিশত অ্যারালের বুকে। লেকটি ধীরে ধীরে শুকাতে শুরু করে। ২০১৪ সালের নাসার প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায় হ্রদটির পূর্বাঞ্চলীয় বেসিনের পুরোটাই শুকিয়ে গেছে। অঞ্চলটি এখন অ্যারালকুম মরুভূমি নামে পরিচিত।

অ্যারাল সাগরের জলরাশি কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত ছিল। এ হ্রদটির আয়তন ছিল ৬৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার। যা ১৯৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশই শুকিয়ে গেছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিল অ্যারাল সাগর। সাগরটি শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানকার ভূ-অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অ্যারাল সাগর তীরবর্তী এলাকার আবহাওয়া মোটেও বসবাসের জন্য উপযুক্ত ছিল না। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ১০০ মিলিমিটার, যা যে কোনো প্রাণীর বসবাসের জন্য প্রতিকূল। প্রতি লিটার পানিতে লবণের পরিমাণ ছিল গড়ে ১০ গ্রাম করে। হাতেগোনা কয়েক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ বেঁচে থাকত সেখানে। এদেরকে ঘিরে অ্যারালের বুকে গড়ে উঠে ক্ষুদ্র মৎস্যশিল্প।

সাগরটি শুকিয়ে যাওয়ার পেছনের মূল খলনায়ক তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৮ সালে গড়ে তোলা সোভিয়েত তুলা শিল্প তখন সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেছিল। সোভিয়েত সরকার তাই বিশ্ব বাজার ধরে রাখতে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করার প্রকল্প হাতে নেয়। সির দরিয়া এবং আমু দরিয়া— এই দুই নদীর পানিকে তুলা খেতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্যে নদীর পানি টেনে এনে তুলা চাষ অঞ্চলে সেচ করা হয়। ফলে অ্যারাল হ্রদের দিকে ধাবিত হওয়া পানির পরিমাণ কমে যায়। হ্রদের সঙ্গে কোনো সাগরের সংযোগ না থাকায় আস্তে আস্তে পানির পরিমাণ কমে যায়। পানির পরিমাণ কমে যেতে থাকায় হ্রদের পানিতে লবণের ঘনত্ব মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যায়। ফলে জলজ প্রাণীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এখান থেকে অ্যারাল সাগরের ধ্বংসের সূচনা ঘটে। লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে আবহাওয়ায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে। ঝড়-তুফানের পরিমাণ বেড়ে যায় বহুগুণে। বিভিন্ন গবেষণাগারের রাসায়নিক বর্জ্য, কীটনাশক, শিল্প-কারখানার বর্জ্য অ্যারাল সাগরের পানিতে নিষ্কাশন করা হতো। ১৯৬০ সালের বিশাল হ্রদের পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকে। স্থানীয় অধিবাসীরা বিষয়টি লক্ষ করে। অ্যারালের পানির ওপর নির্ভরশীল অধিবাসীরা উপায় না দেখে অন্য প্রদেশে চলে যেতে থাকে।

১৯৯৭ সালের শুরুর দিকে করা জরিপ অনুযায়ী, অ্যারাল সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ এক সময়ের বিশাল অ্যারাল সাগর সামান্য জলাশয়ে পরিণত হয়। অ্যারাল সাগর বিপর্যয়কে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরা হয়। অ্যারাল সাগর শুকিয়ে যাওয়ার কারণে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অ্যারাল সাগর এলাকার অধিবাসীরা। কারণ তাদের অধিকাংশ নাগরিকের আয়ের প্রধান উৎস ছিল এই হ্রদটি। তাই সাধারণ জনগণের আর্থ-সামাজিক কাঠামো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। পানি শুকিয়ে গেলেও লবণ থেকে যায়। বিপর্যয়ের কারণে পূর্বের অ্যারাল সাগর উপকূলে ঘন লবণের স্তূপের সৃষ্টি হয়েছে। নয়া শতাব্দী থেকে সংগৃহিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

GIPHY App Key not set. Please check settings

আফগানিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত ৩৩

মকবুলকে ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ