আজ : ৬ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সোমবার প্রকাশ করা : নভেম্বর ১৩, ২০২০

  • কোন মন্তব্য নেই

    স্তিমিত বর্নবৈভব

    ভাদ্র মাসের আজ দুইদিন হলো।  শরৎকাল শুরু হয়েছে।  বর্ষার বিষন্ন-বিধুর নিঃসঙ্গতা আর নেই, তাই নিঃশব্দ চরণের আবির্ভূত হয়েছে শরত রানী। চারদিকে শুভ্রতার ছোয়া।  গাছের পাতায় ঝকঝকে রোদের ঝিলিক, ভরা নদীর পূর্নতা সব মিলিয়ে রুপ- লাবণ্যের জাগরণ হয়েছে বাংলাদেশের বুকে।

    কিন্তু  নিশার মনে কোনো শান্তি নেই। সে বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। ভাবছে এখন তো সেপ্টেম্বর মাস চলে তার মানে শরৎকাল শুরু হয়েছে। আকাশে নিশ্চয়ই শুভ্র মেঘের ছড়াছড়ি। নদীর তট জুড়ে  কাশের মেলা।  কিন্তু তার দৃষ্টি কেবল জানালার ওপারের আকাশটুকুর ওপারে কোথাও যেতে পারছে না।

    এরই মধ্যে নিশার আম্মু এলো। হাতে খাবার আর ওষুধ।
    -নিশু, মামনি উঠেছ তুমি?  শরীরটা কী ভালো লাগছে একটু মা?
    -হ্যাঁ আম্মু।  এখন শরীর ভালো লাগছে।
    -চলো এখন খাবার আর ওষুধটা খেয়ে নাও।
    -আচ্ছা আম্মু।
    নিশাকে খাইয়ে ওর আম্মু চলে গেল।

    নিশা নবম শ্রেণিতে পড়ে।  তার শরীরে ভয়ঙ্কর অসুখ৷ ডাক্তার বলেছে আর সর্বোচ্চ ২-৩ মাস বাঁচবে।  বাবা- মায়ের মনে পাহাড়সম কষ্ট।  মা তো প্রায় সারাদিনই মুখ লুকিয়ে কাঁদে। কিন্তু নিশাকে তারা এসব কিছুই জানতে দেয় নি।  তার খুশির জন্য তাদের কত আয়োজন৷ তারা কত অভাগা বাবা-মা  প্রান প্রিয়  সন্তানের মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে তাদের বেলা কেটে যাচ্ছে।

    বিছানায় বসে আছে নিশা। সারাদিনই এই রুমের মধ্যেই থাকে সে। আর ভালো লাগে না । নিশার খুব বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে।  সে বইয়ে পড়েছিল,  ঋতুরঙ্গশালায় শরতকে বলা হয় ঋতুরাণী। হালকা কুয়াশা আর বিন্দু বিন্দু জমে ওঠা শিশির, শারদপ্রভাতের প্রথম সলজ্জ উপহার। এর ওপর যখন  সূর্যের আলো পড়ে তখন মনে হয় চারদিকে ছড়িয়ে আছে অজস্র মুক্তোদানা। আরও কত নয়নাভিরাম বর্ননা। সেই থেকেই এই ঋতুটার প্রতি বড্ড ভালোবাসা তার। নিশার বহুদিনের শখ স্নিগ্ধ এক শরত বিকেলে গ্রামে ঘুরতে যাওয়ার। গভীর আবেগে শরতের সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করা।  শান্ত নদীর পাশের মেঠোপথটা দিয়ে হেঁটে চলা, খোলা মাঠের নিচে শুয়ে  একদৃষ্টিতে আকাশে পেজা তুলোর মতো থাকা মেঘগুলোর হুটোপুটি অবলোকন করা। কিংবা নদীতটে থাকা কাশফুলগুলোর মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া। এরপর যখনই  নীল মেঘের ভেলা অস্তমিত সূর্যের সাথে বাড়ির পথ ধরবে তখন নিশাও তাদের পথ ধরেই বাড়ির পথে হাঁটবে। শুনেছে শরত রাতে চাঁদ নাকি মাটির শ্যামলিমায় ঢেলে দেয় জোছনাধারা। নিশার বড্ড শখ এমনি এক সন্ধ্যায় অবারিত জোছনাকে গায়ে মেখে কোনো শান বাঁধানো পুকুর ঘাট কিংবা  উঠোনে বসে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মগ্ন হয়ে যাওয়া-
    “এসো শরতের অমল মহিমা, এসো ধীরে
    চিত্ত বিকাশিবে চরন ঘিরে
    বিরহ তরঙ্গে আকুলে সে দোলে
    দিবাযামিনী আকুল সে দোলে ”

    আর ভেসে আসা শিউলীর সুবাসকে প্রান ভরে নিজের ভিতর শুষে নেওয়া।বড্ড শখ নিশার এমনটা করার। নিশা মনে মনে বলে আজকে আম্মু  আসলে আম্মুকে  বলবে সে এ কথা। কিন্তু আম্মুটা যে কঠিন ; মুখের উপরই না করে দিবে।  বলবে শরীর ভালো হয়ে নিক তারপর।  আসলে আব্বু-আম্মু তার কাছ থেকে সবসময় কী যেন একটা কথা লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। তার কী কোনো কঠিন সমস্যা হয়েছে?  বড় কোনো রোগ?  এমন ভাবনা যখন নিশার মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছিল তখনই নিশার মা এসে ঘরে ঢুকল।
    -নিশু,  কী করছো তুমি?  শরীর ভালো লাগছে?
    -হ্যাঁ আম্মু, আমার তো সব ঠিকঠাকই আছে।  একেবারে পারফেক্ট। এই বলে হেঁসে দেয় নিশা।
    নিশার আম্মুর মুখেও ফ্যাকাশে হাসি দেখা যায়। বুকের ভিতর পোষা দুঃখটা যে তাকে কুড়েঁ কুঁড়ে খাচ্ছে।
    নিশা বলে, আম্মু একটা কথা বলব? রাগ করবে নাতো?
    -না,  রাগ করব কেন। তুমি বলো
    -আম্মু আমার না খুব বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে।  এক শরত অপরাহ্নে নদীর পাড়ে বসে শরতকালকে দেখা।  তার নীলাম্বরী রুপকে আলতো করে ছুয়ে…
    -নিশু মা,  এখন এসব কিছুই হবে না। আগে তোমার শরীর সুস্থ হোক। তারপর সব দেখা যাবে।
    -কেন আম্মু আমার কী হয়েছে? তোমরা আমার কাছ থেকে কিছু লুকোচ্ছো।  বলো না আম্মু?  আমার কোনো বড় কোনো অসুখ করেছে ?  আমি কী বাঁচব না আর?
    মেয়ের কথা শুনে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় নিশার মা।  কী বলবে এখন মেয়েকে সে ।  নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল,
    -এত কথা বলতে হবে না। আচ্ছা  আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলে দেখি কী হয়। কবে কী  যাওয়া যায়। এখন রেস্ট নাও তুমি।
    এই বলে তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে এলো নিশার মা। চোখ বেয়ে অশ্রুর জোয়ার নেমেছে।  কীভাবে বলবে মেয়েকে সে এই কথা।  এতদিন ধরে যেভাবে শত দুঃখের মধ্যেও আশার পাখিটাকে যত্নে পুষে রেখেছে  তা আজ এভাবে শেষ করে দিতে পারে না।
    দুপুরে যখন নিশার বাবা বাসায় এলো তখন তিনি সব কথা তাকে খুলে বললেন।  তারপর ভাবলেন তারা মেয়েটার কোনো শখই তো অপূরনীয় রাখেনি। এই কথাটা না রাখলে মেয়েটা বড্ড দুঃখ পাবে। শেষ সময়টায় দুঃখ নিয়ে…..  না,  না এটা হয় না।  তাই সবশেষে সিদ্ধান্ত হলো আগামী পরশু তারা গ্রামের বাড়ি নিশাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। রাতে ঘুমানোর আগে নিশাকে যাওয়ার কথা জানায় তার  মা।  নিশার সে কী আনন্দ!
    উফফ! কতদিন পরে একটু ঘুরতে যাবো। তাও নদীর পাড়ে  শরত-নন্দন।  ভাবা যায়!
    ক্রমে ক্রমে দিন এগিয়ে এলো।  সকাল থেকেই গোছগাছ চলছে। এর মধ্যে নিশার মা ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিয়েছে।  ডাক্তার অবশ্য কিছুটা দ্বিমত করছিলো কিন্তু তবুও মেয়ের বহুদিনের শখ তাই সে মেনে নিয়েছে।
    দুপুর নাগাদ তারা গিয়ে পৌঁছাল। তারপর বিকালবেলা তারা ঘুরতে বের হলো।  নিশার সেই আকাঙ্ক্ষিত নদীর পাড়। খুশিতে আজ সে আত্মহারা। নদীর পাড় ধরে বাচ্চা শিশুর মতো ছুটে চলেছে সে। আজ তার প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করছে।  আকাশের মেঘের ভেলাগুলো কী সুন্দর ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে।  আজ কত আনন্দের দিন।  আরে! পাশে কী সুন্দর কাশফুলের সমারোহ। যেন শ্বেতশুভ্র এক স্বপ্নরাজ্য  সে অবলোকন করছে।  দৌড়ে সেখানে চলে যায় নিশা।  দুহাতে কাশগুলোকে আলতো করে ছুয়ে দেয়। তার বাবা-মাও তার এ আনন্দ দেখে বেশ তৃপ্তি পেয়েছেন আজ। একসময় উচ্ছ্বাসের জোয়ারে আন্দলিত হয়ে নিশা কাশের সাদা শাড়িতে শুয়ে পড়ে।  আহ! কী তৃপ্তি এর নামই হয়তো জীবন। বেশ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ নিশার শ্বাস বেড়ে যায়। মা, বলে এক চিৎকার। তারপর সব নিঃস্তব্ধ। আস্তে করে বন্ধ হয়ে যায় তার আত্মহারা চোখদুটি।
    অস্তমিত সূর্যের সাথে মেঘেরা বাড়ি ফিরছে। সেই সাথে নিশাও। সেদিন প্রচুর জোছনা ছিল।চাঁদের গা বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে জোছনা পড়ছে।  চারদিক থেকে শিউলী ফুলের সুবাস ভেসে আসছে। তার কবিতার বদলে  উঠোনে গুনগুন করে  কুরআন শরীফ পড়ছে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে।সবই হচ্ছে তার আকাঙ্ক্ষা মতোই।  শুধু সেই নীরব। এক কঠিন মহাজাগতিক নিরবতা তাকে ঘিরে রেখেছে।যে নিরবতা ভেঙে কখনো সরব হওয়া যায় না৷ কখনো না।
    হজগতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।  নিশার উচ্ছ্বাসের মতো শরতের প্রসন্ন বর্ণবৈভবও একসময় স্তিমিত হয়ে পড়ে। আনন্দমুখর  উৎসবও-সমারোহ থেমে যায়। কালচক্রের আবর্তনে শুধুই পট পরিবর্তন। শিশির বিছানো, শিউলি ঝরা পথের উপর দিয়ে একসময় শরৎও নিঃশব্দে চলে যায়।সকল বর্ণবৈভব একসময় স্তিমিত হয়ে পড়ে….

    নামঃ নাজিফা আক্তার শারিকা
    শ্রেণী-নবম
    শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঃ সৃজনী বিদ্যানিকেতন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
    দুমকী, পটুয়াখালী

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *